চতুর্দশ অধ্যায়: তার প্রেমিক এক চড়ে একটি আদিখ্যেতার দৈত্যকে হত্যা করল (৩)
রাত গভীর হয়ে এলে, অবশেষে বায়াও রাতের খাবার খেলো। আসলে এই সময়টাতে একে রাতের জলখাবারও বলা যেতে পারে। স্যুয়ে ইয়ানের রান্না করা খাবার সে শুধু বসে উপভোগ করছিল।
স্যুয়ে ইয়ান যখন রান্নাঘর থেকে বেরোল, বায়াও কোনো ভঙ্গির তোয়াক্কা না করে চেয়ারে বসে মোবাইলে স্ক্রল করছিল। বিরক্ত হয়ে সে একসময় একটা উপন্যাস পড়তে শুরু করল। উপন্যাসটি খুব জনপ্রিয়, কিন্তু পড়তে পড়তে তার ভ্রু আরও কুঁচকে গেল।
এটি ছিল একটু ভৌতিক উপাদান মেশানো উপন্যাস। একদল মানুষ অজ্ঞাত কারণে এক অদ্ভুত ছোট্ট শহরে চলে যায়, সেখানে তাদের একটি বাঁচার খেলা খেলতে বাধ্য করা হয়। দিনের বেলায় শহরটি খুব শান্ত, কিন্তু রাত নামলেই সবখানে বিপদ ঘুরে বেড়ায়—জানোয়ার, নরখাদক, খুনি—সব বেরিয়ে আসে।
যখন সবাই ভয়ে ভয়ে নানা উপায় খুঁজে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে, তখন একজন ব্যতিক্রম। সে হল গল্পের নায়িকা—নরম, স্নিগ্ধ আর মায়াবতী। সে জেগেই একটি সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, এবং ওই সিস্টেম তাকে অপার স্নেহে ভরিয়ে রাখে। সে একটু আদর করে কিছু বললেই, এমনকি ভূত-প্রেতরাও তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে।
অবশ্য, যারা তার এই আদুরে স্বভাব পছন্দ করত না, তারা সবাই করুণভাবে মারা যায়। বিশেষ করে যে মেয়েটি তার সঙ্গে শত্রুতা গড়েছিল, সে তো সম্পূর্ণ নিখোঁজ হয়ে যায়।
কিন্তু নায়িকা কাঁদতে কাঁদতে একটু আদুরে হয়ে উঠলেই, সদ্য মানুষ খুন করা ভূতটাও তাকে ছোট রাজকুমারী বলে আদরে ভরিয়ে দেয়।
বায়াও আর পড়তে পারল না। সে বেরিয়ে এসে বইয়ের নামের দিকে তাকাল—‘আমি কাঁদতে কাঁদতে ভূতেদের রাজকুমারী হয়ে উঠেছি’।
স্যুয়ে ইয়ান শেষ ডিশটি নিয়ে এল। এক নজরেই সে বায়াওয়ের মুখের বিরক্তি বুঝতে পারল। টেবিলের চার পদ আর এক বাটি স্যুপের দিকে তাকিয়ে সে সাবধানে বায়াওয়ের পাশে বসল, উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘‘বায়াও, আমার রান্না তোমার ভালো লাগেনি?’’
বায়াও তার দিকে তাকাল, ‘‘অবশ্যই ভালো লেগেছে। আসলে আমি একটু আগে একটা উপন্যাস পড়ছিলাম, তাই মনটা খারাপ হয়ে গেছে।’’
স্যুয়ে ইয়ান কৌতূহলভরে জানতে চাইল, ‘‘কোন উপন্যাস?’’
‘‘এই তো...’’ বায়াও মোবাইলটা হাতে নিয়ে অবাক হয়ে দেখল সেই উপন্যাসটা আর বইয়ের তাকেও নেই। ব্রাউজিং ইতিহাস খুঁজেও কিছু পেল না। বিষয়টা তার কাছে অদ্ভুত লাগলেও, সেভাবে গুরুত্ব দিল না। ‘‘মানে, আমি যে উপন্যাসটা পড়ছিলাম, সেটা আমার একদমই ভালো লাগেনি। গল্পটা এরকম, একদল মানুষ এক রহস্যময় শহরে ঢুকে পড়ে, সেখানে নানা রকম নরখাদক, খুনি ঘুরে বেড়ায়, কিন্তু নায়িকা দারুণ ভাগ্য নিয়ে এসেছে। ও একটু আদর করলে সবাই তাকে ভালোবেসে ফেলে, ও হয়ে যায় ছোট রাজকুমারী।’’
বায়াও স্যুয়ে ইয়ান এগিয়ে দেওয়া ভাতের বাটি হাতে নিয়ে স্যুপের চুমুক দিল, হালকা হেসে বলল, ‘‘ভাগ্যিস, তুমি কাউকে ছোট রাজকুমারী ডাকার অভ্যাস রাখো না, না হলে আমার গায়ে কাঁটা দিত।’
স্যুয়ে ইয়ান নরমভাবে বায়াওয়ের গা ঘেঁষে রইল। সে স্যুপ খেয়ে শেষ করতেই আবার বাটিতে অল্প ভাত তুলে দিলো। সে আজ্ঞাবহের মতো বাটি আর চপস্টিক তার হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, ‘‘বায়াও, আমি তেলতেলে নই।’’
বায়াও তার দিকে তাকাল, ‘‘সোজা হয়ে বসে খাও।’’
স্যুয়ে ইয়ান ঠোঁট চেপে সোজা হয়ে বসল, কিন্তু তার চোখ মাঝে মাঝে ফাঁকে ফাঁকে বায়াওয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। বায়াও অমনোযোগী হলেই সে ধীরে ধীরে ওর দিকে আরও বেশি সরে আসে।
বায়াও তখনও ভাবছিল, ‘‘এখনকার লেখকদের কল্পনা সত্যিই দুর্দান্ত। বাস্তবে কোথায় এমন কোনো দানব-শহর আছে?’’
স্যুয়ে ইয়ানের চোখে রহস্যের ঝিলিক। সে সমর্থন করে বলল, ‘‘বাস্তবে কোথায় এমন দানব-শহর থাকতে পারে?’’
‘‘কয়েকদিন আগে আমাদের ক্লাসের হুয়া হুয়া আমায় জিজ্ঞেস করছিল, মানুষের দেহ মাটিতে পুঁতে দিলে পরের বছর কি অনেক মানুষ গজাবে? আমি মনে করি, ও বাচ্চাটা এসব অনর্থক ইন্টারনেটের জিনিস বেশি দেখে ফেলেছে।’’
সে মাথা নেড়ে বলল, ‘‘হ্যাঁ, এসব অনর্থক কিছু দেখেছে।’
বায়াও এক টুকরো মাংস স্যুয়ে ইয়ানের বাটিতে তুলে দিয়ে বলে চলল, ‘‘আদং গতকাল থেকে অসুস্থ, শুনেছি খারাপ কিছু খেয়েছে বলে হাসপাতালে ভর্তি। তাদের বাড়িতে এখন শুধু এক বৃদ্ধা আছেন। দু’দিন আগে ঝড়ে গাছের ডাল পড়ে জানালার কাচ ভেঙে গেছে। তুমি কাল একটু তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরে আসো, আমরা মিলে গিয়ে জানালাটা বদলে দেবো।’
সে মাথা নাড়ল, ‘‘ঠিক আছে, জানালা বদলে দেবো।’’
বায়াও আজকের শহরের বড় ছোট নানা ঘটনার কথা বলে গেল। স্যুয়ে ইয়ান শুধু সাড়া দিয়ে যায়। তার কথা বিশেষ অর্থবহ না হলেও, বায়াও যা বলে সবকিছুতেই সে উত্তর দেয়।
এই সময়েই, সে আবার আলগা হয়ে বায়াওয়ের গা ঘেঁষে রইল। অবশ্য, তার গড়ন বায়াওয়ের চেয়ে অনেক বড়, পুরোপুরি ওর গায়ে হেলান দেওয়া সম্ভব নয়। তাই সে বেঁকে, নিজেকে গুটিয়ে ওর গায়ে সেঁটে রইল। অস্বস্তি হলেও সে কারও তোয়াক্কা করে না।
বায়াও বিরক্ত হয়ে বলল, ‘‘তোমার কি হাড় নেই?’’
স্যুয়ে ইয়ানের চোখ দুটো কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে ওর দিকে তাকাল, যেন ঘুমে ঢুলছে। তার স্বভাবটাই অলস, যতদূর সম্ভব শুয়ে থাকবে, না হলে বায়াওয়ের গায়ে হেলান দেবে।
বায়াও আগে ছোট ভিডিও দেখার সময় এক নারী ব্লগারকে বলেছিল শুনেছিল—স্বামীর জন্য কখনোই কোনো লক্ষ্যহীন অলস পুরুষকে বিয়ে করা ঠিক নয়, যারা ঘরে বসে থাকে, তাদের বিয়ে করা মানে দয়া করে খাওয়ানো।
বায়াও একবার দেখে পাশ কাটিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু স্যুয়ে ইয়ান সেটা মনে রেখেছিল। পরদিনই সে অন্ধকার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসে শহরের স্থানীয় কমিটিতে পাইপ মেরামতের কাজ জুটিয়ে নেয়।
চাকরি পাইপ মেরামতের হলেও, সে সবকিছুই একটু আধটু পারে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, শহরের কেউ সাহায্যের দরকার হলে তারা সরাসরি স্যুয়ে ইয়ানের কাছে যায় না, বরং বায়াওয়ের কাছে আসে।
এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। স্যুয়ে ইয়ান আগে প্রায় ঘরেই থাকতো, বাইরেই যেত না। শহরের মানুষ তাকে দূরত্বপূর্ণ ভাবত, তাই ওর সঙ্গে মেশার সুযোগই পায়নি।
উল্টে বায়াও, সে মাত্র ছয় মাস আগেই এখানে এসেছে, এখন সবাই তাকে চেনে।
বায়াও কাতর স্বরে বলে উঠল, ‘‘তুমি সত্যিই বাইরে বেরিয়ে একটু হাঁটো, শুধু সারাদিন ঘরে বসে থাকো না।’’
বলতে বলতেই সে একটি কাঁটামুক্ত মাছের টুকরো ওর মুখের সামনে ধরল। স্যুয়ে ইয়ান মুখ খুলে এক চুমুকে খেয়ে নিল। মাছ নিজে খেলে সে কখনো কাঁটা বাছবে না। শুধু কাঁটাই নয়, এমনকি পাঁজরের হাড়ও সে ফেলে না, একেবারে চিবিয়ে গিলে ফেলে। বায়াও প্রথমবার তার সঙ্গে খেতে গিয়ে দেখেছিল সে কীভাবে হাড় চিবিয়ে গিলে নিচ্ছে, তখন সে মজা করে বলেছিল, ‘‘তোমার দাঁত দারুণ শক্তিশালী!’’
তখনই স্যুয়ে ইয়ান মাথা নামিয়ে নিয়েছিল, এলোমেলো কালো চুল চোখ ঢেকে দিয়েছিল, শুধু লাল হয়ে যাওয়া কানটাই দেখা যাচ্ছিল।
বায়াওয়ের এগিয়ে দেওয়া মাছের টুকরো খেয়ে সে যেন মধু খেল। চোখ আধবোজা, গা হেলে, কিন্তু কণ্ঠে সেই অলস, অথচ স্নেহময় টান, ‘‘ঘরে বায়াওয়ের গন্ধ পাই, তাই ঘরে থাকতেই ভালো লাগে।’’
বায়াও অবাক, ‘‘তুমি কি কুকুর, যে গন্ধে এতটা সংবেদনশীল?’’
স্যুয়ে ইয়ান অনেকক্ষণ ভেবে গম্ভীরভাবে বলল, ‘‘বায়াও, আমার শরীরে কুকুরের কোনো জিন নেই। তবে তুমি চাইলে, আমি তোমার কুকুরও হতে পারি।’’
বায়াও মুহূর্তে চুপ মেরে গেল।
পরদিন দু’জনেরই অফিস, তাই বায়াও তাগাদা দিল দ্রুত খেতে। তারপর একসঙ্গে বাসন গুছিয়ে ধুয়ে রাখল। শেষে তারা শোবার ঘরে গিয়ে শুতে গেল। স্যুয়ে ইয়ান তখনই হাত পা দিয়ে বায়াওয়ের গায়ে লেপ্টে গেল।