৫৩তম অধ্যায়: আবারও তিতিরের গোপন অনুপ্রবেশ
আন্নাকে উদ্ধার করার আগের অভিযানে শুলৎস যে পাহারার তথ্য দিয়েছিল, তাতে কিছু ভুল ছিল। তাই এবার জগদ্ধাত্রী পুরোপুরি সতর্ক, একটুও ঢিলেমি দেখানোর সাহস করছে না। শুলৎস নিজেও বলেছিল, তথ্য তো স্থির, কিন্তু মানুষ চলমান—কাজেই পরিস্থিতি বুঝে চলতে হবে।
‘বড্ড বেশি পরিস্থিতি বুঝে চলতে বলছ, তোমরা তো আর এখানে এসে ঝুঁকি নিচ্ছো না, বসে বসে শুধু মজা দেখছো!’
অন্ধকারে জগদ্ধাত্রী মনে মনে বহু কথা বলে নিজের রাগ ঝাড়ল। অভিযোগ শেষে দেখল, সামনে থাকা পাহারাদারটি পাশের গাছের নিচে গিয়ে প্রস্রাব করতে ব্যস্ত। এই সুযোগে, সে নিঃশব্দে এগিয়ে গেল। আসলে সে সুযোগ পেলে পাহারাদারকে অজ্ঞান করে দিত, কিন্তু যেমনটা শুলৎস বলেছিল, ‘মানুষ চলমান’—ঠিক তখনই পাহারাদারটি প্রস্রাব করতে চলে গেল।
সশস্ত্র গুদামঘরটি সিমেন্ট আর লোহার তৈরি, তিনতলা বিশাল এক ভবন। মূল প্রবেশদ্বার একতলার ভারী লোহার দরজা; শুধু পাসওয়ার্ডে খুলবে না, দরজা খোলা-বন্ধে প্রচণ্ড শব্দ হয়। পাহারাদারদের না জানিয়ে ভেতরে ঢুকতে হলে আনঅফিসিয়াল প্রবেশপথই ভরসা।
যেমন, গুদামঘরের বাইরে কয়েকটি নর্দমা আছে। এর একটি ভেতরের বায়ু চলাচলের পাইপের সঙ্গে মাত্র পাতলা এক দেয়াল দিয়ে আলাদা। সেই পাইপ বেয়ে ওপরে উঠলে, জগদ্ধাত্রী সরাসরি গুদামঘরের সর্বোচ্চ তলায় পৌঁছাতে পারবে—এটাই তার গোপন অনুপ্রবেশ।
জগদ্ধাত্রী জানে না, শুলৎস এত ভালোভাবে গুদামঘরের নকশা জানল কীভাবে। হয়তো তার বিশেষ তথ্য সংগ্রহের উপায় আছে। আশেপাশের পাহারাদারদের এড়িয়ে চলা খুব কঠিন নয়, জগদ্ধাত্রী ইতিমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান মনে গেঁথে নিয়েছে। সে কালো পোশাকে মাটিতে ধীরে ধীরে হামাগুড়ি দিচ্ছে, বেছে নিয়েছে সবচেয়ে নিরাপদ পথ। সামনে যদি কারও চোখে পড়ে না যায়, পাহারাদারদের পক্ষে তাকে খুঁজে পাওয়া কঠিন।
দেখতে দেখতে, গুদামঘর থেকে কয়েক দশক মিটার দূরে পৌঁছে গেল সে। ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল একটি প্রহরী টাওয়ার, শক্তিশালী অনুসন্ধানী বাতি বারবার গুদামঘরের চারপাশে ঘুরছে। জগদ্ধাত্রী দ্রুত ঝোপের আড়ালে নিজেকে আড়াল করল।
আরও দুজন পাহারাদার তার পাশ দিয়ে চলে গেল।
তারা বুঝতেই পারল না, কেউ তাদের কাছে লুকিয়ে আছে। হাসতে-হাসতে একজন বলল, কিছুক্ষণ পর ডিউটি শেষ হলে একটু মদ খাবে, অন্যজন বলল, তার কাছে কিছু খাবার আছে—একসঙ্গে খেলে মজাই আলাদা।
শুলৎস বলেছিল, অনুসন্ধানী বাতি প্রতি পনের সেকেন্ডে একবার চারপাশে ঘোরে; পুরোটা শেষ হতে তিরিশ সেকেন্ড লাগে। অর্থাৎ, বাতি তার পাশ দিয়ে গেলে, তার হাতে থাকবে পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ড—এই সময়ে সে গুদামঘরের কাছে পৌঁছাতে পারবে।
সময় হিসেবে যথেষ্টই বেশি।
তবুও অনুপ্রবেশের সময় চারপাশের ডজনখানেক চৌকি, যেকোনো সময় ঘুরে আসা টহলদল—সব মিলিয়ে তাকে চরম সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
এখনই সময়।
দুই পাহারাদার টহল দিয়ে সরে গেল, অনুসন্ধানী বাতিও ঠিক তখনই সেদিক থেকে ঘুরে গেল। জগদ্ধাত্রী আবার মনে মনে চারপাশের চৌকির অবস্থান মনে করল। তারপর শরীর ঝাঁপিয়ে বেরিয়ে এল আশ্রয় থেকে, যেন ধনুক থেকে ছোড়া তীর।
বাতাস কানে হু-হু করে বাজছে, রাগের তীব্রতায় জগদ্ধাত্রী আশেপাশের সামান্য পরিবর্তনও টের পাচ্ছে। দেখল, কাছের এক চৌকিতে পাহারাদার দেয়ালে হেলান দিয়ে হাই তুলছে, তার গতি এত মন্থর যে জগদ্ধাত্রী তার দুই ঠোঁটের ফাঁকের লালার সূক্ষ্ম সুতোটাও দেখতে পাচ্ছে।
এ অনুভূতি অদ্ভুত—সবকিছু স্পষ্ট, ধীর, শুধু নিজের শরীর-মন দ্রুত ও স্বাভাবিক।
নিঃসন্দেহে, জগদ্ধাত্রী পৌঁছে গেল সেই বিশেষ নর্দমার কাছে। দুই হাতে ধাতুর ঢাকনাটা তুলে পাশে রাখল, প্রবল দুর্গন্ধে ভুরু কুঁচকে গেল। তারপর মুখোশটা টেনে মুখে দিল, নিচে তাকিয়ে এক ঝাঁপ দিয়ে নর্দমায় নেমে পড়ল, সঙ্গে সঙ্গে ঢাকনাও টেনে লাগিয়ে দিল।
ছোট টর্চ হাতে নিয়ে, জগদ্ধাত্রী নর্দমায় কখনো গভীরে, কখনো অগভীরে হাঁটছে। গুনে গুনে সাত নম্বর মুখে পৌঁছে লোহার গ্রিলটায় টোকা দিল। ভাবল, এটা তো শুলৎস বলেনি—এখানে গ্রিল থাকবে।
শুলৎস জানায়নি, এখানে লোহার গ্রিল আছে। তবে জগদ্ধাত্রী প্রস্তুত ছিল। এক হাতে গ্রিলের তালা চেপে ধরে, আবার রাগের জোরে হঠাৎ ‘ঝন’ শব্দে সেই মোটা তালা ছিঁড়ে ফেলল।
খুব বেশি কষ্ট হয়নি, কারণ তালাটা নর্দমার পানিতে অনেক আগেই জং ধরে গেছে।
দুর্গন্ধে মাথা ঘুরে গেলেও, মুখোশ পরে থাকলেও জগদ্ধাত্রী প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ছিল। সে ভাবতে চাইল না, এই নর্দমার শেষ কোথায়। কিন্তু আর কীই বা করার আছে? এসে তো পড়েইছে, এখন কি আর ফিরে যাবে?
জগদ্ধাত্রী হাল ছাড়ার মানুষ নয়। নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দিল—
‘কিছু না, বেশি গন্ধ নিলে অভ্যস্ত হয়ে যাব।’
কিন্তু সত্যি এ গন্ধে কখনো অভ্যস্ত হওয়া যায় না। জগদ্ধাত্রী জানে না, কতক্ষণ ধরে সে এই পাইপ বেয়ে এসেছে, শুধু মনে হল জ্ঞান হারাতে চলেছে। তখনই ওপরের দিকে ওঠা এক মই দেখতে পেল।
শেষ পর্যন্ত এসে পৌঁছল।
জগদ্ধাত্রী মই বেয়ে ওপরের মাথায় ওঠেনি। চুপিচুপি এক, দুই, তিন...সতেরো গুনে, ব্যাগ থেকে বের করল এক ছেনি। দেয়ালে রেখে খুঁটিয়ে টুকরো টুকরো করে কাটতে লাগল।
হাতুড়ি নেই, শুধু ছেনি দিয়ে দেয়াল খোঁড়া বেশ কষ্টকর। কিন্তু হাতুড়ি ব্যবহার করলে শব্দ হয়ে যাবে, পাহারাদাররা টের পেয়ে যাবে। এখানে সময়ের সীমা নেই—ভোর হওয়ার আগেই কাজ শেষ করলেই চলবে।
জগদ্ধাত্রী একসময় বেশ খানিকটা অংশ কেটে ফেলল। অবশেষে নর্দমা আর বায়ু চলাচলের পাইপের মাঝখানের দেয়াল ভেদ করল। আনন্দে পথটা বড় করতে লাগল—অবশেষে এই দুর্গন্ধ থেকে মুক্তি!
বায়ু চলাচলের পাইপে ঢুকে পড়ল সে। জায়গাটা এখানে অনেক সরু, দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। হামাগুড়ি দিয়ে একটানা এগিয়ে গেল, পাইপের উঁচু অংশে এসে দুই হাত-পা দিয়ে ঠেলে, টিকটিকির মতো ওপরের দিকে উঠতে লাগল।
চূড়ায় পৌঁছে আন্দাজ করল, গুদামঘরের তৃতীয় তলায় উঠে গেছে। কান পাতল নিচের সিলিংয়ে, কোনো শব্দ পেল না। ধীরে ধীরে সামনের লোহার জালটা সরাল, নিচে উঁকি দিল।
কেউ নেই।
চোখের সামনে সারি সারি বন্দুকের তাক, এত অস্ত্র যে গুনে শেষ করা যায় না। মুখোশ খুলে আনন্দে মুখ হাঁ হয়ে গেল জগদ্ধাত্রীর।