চতুর্দশ অধ্যায় পরিশিষ্ট
[উত্তরকথা]
এই অধ্যায়ের নাম নিয়ে আমি বহুদিন ধরে ভাবছিলাম, কিন্তু কিছুতেই উপযুক্ত নাম খুঁজে পাইনি। তাই এই খাতার ওপর সর্বদা লেখা ছিল— ‘নামহীন মামলা’। এমনকি পরে, যখন আমি শেন তাংঝিকে এটি পড়তে দিলাম, তখনও ফাইলের ওপরে বড় করে লেখা ছিল, ‘নামহীন মামলা’।
শেন তাংঝি পড়ে শেষ করার পর কোনো মন্তব্য করেনি। শুধু বলেছিল, “ভবিষ্যতে আবার যদি এসব ফাইল আমায় পড়তে দাও, তাহলে আর কোনো ‘নামহীন মামলা’ দিয়ে আমাকে ফাঁকি দেবে না।”
লাও দাও বরং একটা মন্তব্য করেছিল। বলল, “পঁচা মাছের বড় আপা ঠিকই বলেছে। ভবিষ্যতে ফাইলের নামগুলো একটু ভালোভাবে ভেবে দিও— বিশেষত যেগুলোয় আমি অভিনব কিছু করি।”
আমি শুধু হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম। নিয়ম মেনে আবার ফাইলগুলো গুছিয়ে রেখে দিলাম, নামের জায়গায় তখনো স্পষ্টভাবে লেখা রইল— ‘নামহীন মামলা’।
আসলে এই মামলাটি খুব জটিল ছিল না, শুধু এর ভেতরে কিছু সাধারণ বোধগম্যতার বাইরে অসাধারণ ঘটনা ঘটেছিল। কেউ চাইলে একে ভূত-প্রেত, অপদেবতা বা অতিপ্রাকৃত শক্তি বলে ভাবতে পারে, কিন্তু আমার কাছে সবই একই কথা।
এই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল সেই অদ্ভুত গাঢ় লাল রঙের শৃঙ্খলটি। আমার প্রাথমিক অনুমানের সঙ্গেও তা মিলে গিয়েছিল। কিন্তু অবাক করার মতো ব্যাপার, শেষ পর্যন্ত, আমি নিজেও বুঝতে পারিনি এই শৃঙ্খলটি আসলে কী বস্তু।
এর কার্যকারণ বিচার করে মনে হয়, ব্যাপারটা সত্যিই অবিশ্বাস্য— এটি মানুষের সবচেয়ে অন্ধকার পাশকে উস্কে দিতে পারে, অন্যের শরীর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, আর একই সঙ্গে অনেক ব্যক্তির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে!
আমি শুধু নিজের মতো কিছু অসম্পূর্ণ অনুমানই করতে পারি।
সম্ভবত এই শৃঙ্খলের জন্ম কোনো আকস্মিক ঘটনার ফল। এর জন্য প্রয়োজন ছিল চরম কঠিন কিছু শর্ত, আর সেই শর্তের কঠিনতা এমন, যেমন একজন মানুষ পুরো জীবন ধরে লেখে এক অনন্য সাহিত্যকীর্তি— যেমন ‘স্মৃতির ধারা’।
এখানে একটা বিষয় খেয়াল করা দরকার— এমন সাহিত্যকীর্তির বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এগুলো অননুকরণীয়। যেমন বলা হয়, “রচনা স্বভাবজাত, কুশলী হাতে কেবল ধরা পড়ে”, পৃথিবীতে আর কখনো কেউ, ‘স্মৃতির ধারা’ না পড়ে, হুবহু ওই রকম আরেকটি বই লিখতে পারবে না।
তাই, এই শৃঙ্খলও বোধহয় সম্পূর্ণ একক কিছু।
ইতিহাস আর কিংবদন্তিতে অনেক এমন জিনিস আছে— যেমন প্রাণবাতি, তান্ত্রিক বিদ্যা, মৃতদেহ চালানোর কৌশল, এমনকি বিদেশেও শোনা যায় এক ভয়ের গল্প, যাতে এক বাঁশির কথা বলা হয়, যা মানুষের মন ও শরীর নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
কিন্তু এসবের বাস্তবতা অতি সামান্য। অনেকটা আমাদের শুনতে পাওয়া আধুনিক শহুরে কিংবদন্তির মতোই।
অন্তত আমার জ্ঞান আর পড়াশোনার আলোকে, কয়েকটি নির্ভরযোগ্য বইতেই এমন কিছু সংক্ষিপ্ত উল্লেখ পেয়েছি— পুরোপুরি মেলে এমন কোনো বিবরণ কোথাও দেখিনি।
আর এই কাহিনির মূল বিষয়, আদতে খুবই সাধারণ— প্রতিহিংসা, মানুষের অন্ধকার দিক ইত্যাদি। অথচ পৃথিবীর আনাচে-কানাচে প্রতি মুহূর্তে আরও কত অদ্ভুত ঘটনাই তো ঘটে চলে— এসবই তো মানুষের রকমারি আচরণের প্রদর্শন!
চেং ছেং এই ঘটনার পর, কিছুদিনের জন্য চাকরি থেকে বিরতি নিয়েছিল।
হয়তো তিন মাসের মতো।
আবার যখন ওর সঙ্গে দেখা হলো, সেটা ছিল হঠাৎ একবার। তারপর ও আবার কাজে ফিরে গেল, আর আমরা আগের মতোই একসঙ্গে কাজ করতে লাগলাম।
সেইবার চেং ছেং সঙ্গে এনেছিল ওর মেয়ে, চেং শাওজি-কে।
চেং ছেং খুব আন্তরিকভাবে আমাকে ধন্যবাদ দিয়েছিল। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর বলল, ছোট মেয়েটি আর কিছুই মনে রাখেনি; কেবল মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্ন দেখে, ঘুম ভেঙে কাঁদতে কাঁদতে মাকে খোঁজে।
এরপর ও আমাকে অন্য একটি গল্প শোনাল। বলল, সে মেয়ের স্বপ্নের কথা, নিজের অনুমান, নানান তদন্তের তথ্য, আর অপরাধস্থলের পুনর্নির্মাণ মিলিয়ে একটি কাহিনি গড়ে তুলেছে।
আমারও কিছু প্রশ্ন ছিল, তাই মন দিয়ে শুনলাম।
চেং ছেংয়ের গল্প শোনার পর, বাড়ি ফিরে আমার প্রথম কাজ ছিল, সেই ‘নামহীন মামলা’র ফাইলটা বের করা। ‘নামহীন মামলা’ লেখাটা কেটে দিয়ে, পাশে যত্ন করে লিখলাম— ‘অপরাধের শৃঙ্খল’।
আর সেই বাড়তি গল্পটা আমি সংকলন করে রাখলাম— ‘প্রস্তাবনা : দ্বিতীয় খণ্ড’ হিসেবে।
আচ্ছা, একটা কথা বাড়তি বলে রাখি।
যখন চেং ছেং আমাকে ‘প্রস্তাবনা : দ্বিতীয় খণ্ড’ শোনাচ্ছিল আর মেয়েকে কোলে নিয়ে বিদায় নিচ্ছিল, তখন হঠাৎ খেয়াল করলাম, ওর মেয়ে চেং শাওজি-র ডান হাতের জামার হাতাটা...
একেবারেই ফাঁকা।